তিনশো বছর পর এক ব্যতিক্রমী রাস দেখল নবদ্বীপবাসী
দি নিউজ লায়ন ; তিনশো বছর পর এক ব্যতিক্রমী রাস উৎসব দেখল চৈতন্যভূমির বাসিন্দারা। কোভিড আসলে বড় বালাই! হাজারো ব্যতিক্রম নিয়ে এমন আশ্চর্য রাস সেই সূচনাকালের পর থেকে নবদ্বীপ তথা নদীয়াবাসী কখনও দেখেনি। হিসাব মতো নবদ্বীপের রাস দেখতে দেখতে তিন তিনটি শতক পেরিয়ে এসেছে।
এই দীর্ঘসময়ে নবদ্বীপের রাস উৎসব ঘিরে তৈরি হয়েছে নানান প্রথা- প্রকরণ, রীতিনীতি, ঐতিহ্য। রাজকীয় প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা প্রাচীন রাসোৎসবের এক দামাল উদযাপনে ক্রমশ মানুষ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু করোনা অতিমারির কালে একেবারে নতুন আঙ্গিকে পালিত হল ২০২০ সালের রাস বা শ্রীকৃষ্ণের রাসযাত্রা উৎসব। উচ্ছল, উদ্দাম রাসের পায়ে পায়ে এবার প্রশাসনের হাজারও নিষেধাজ্ঞা। করোনা আবহে রাসের সেই চেনা মুখ একেবারেই অচেনা। আদালতের নির্দেশে দুর্গা, কালী বা জগদ্ধাত্রী পুজোর মতোই প্রশাসনের কড়া নজরদারীতে এবছর রাস উদযাপিত হল চৈতন্যের শহর নবদ্বীপে।
এবছর কেউ রাসের ঐতিহ্যবাহী দীর্ঘকায় মূর্তি গড়া বিরত থেকে, আবার কেউ ঘটে-পটে পুজো করে। এভাবেই ২০২০ রাস উৎসব উৎযাপন করল হাজারও বহিরাগত দর্শনার্থীর পাশাপাশি শহরবাসী। কেউ আকাশ ছোঁয়া বিশ হাতের প্রতিমা নামিয়ে এনেছেন পাঁচ হাতে। আবার কেউ শ’য়ে শ’য়ে মানসিক পুজো, বলিদান, দণ্ডী কাটার প্রথা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ করে পালন করল রাস উৎসব। এবছর নিয়ম কানুনের বেড়াজালে অনেকটাই ঠেকানো গিয়েছে উচ্চকিত শব্দ। ব্যাঞ্জো ক্যাসিও সম্বলিত তাসা বাজানো নিষিদ্ধ হওয়ায় মাইকে বাজল হিন্দি ও বাংলা মিশিয়ে বিভিন্ন সংগীত।
আবার সেই গান থামতে না থামতেই বহুকাল আগের মতো বাজতে থাকল ঢোল-সানাই কিংবা ডগর। করোনা আবহে এ যেন এক সম্পূর্ণ অচেনা রাস। অতিমারির কালে রাসের বাঁক বদলের শুরুটা করেছিলেন গাঁড়াল সম্প্রদায়ের পূজো বলে খ্যাত শ্রীবাসঅঙ্গন পাড়ার বিন্ধ্যবাসিনী প্রতিমার আয়োজকেরা। তারাই প্রথম সবাইকে চমকে দিয়ে ঘোষণা করে ছিলেন এবারে তাঁরা প্রতিমা ছাড়াই ঘটে পুজো করবেন। একই সিদ্ধান্ত নেন নবদ্বীপ ব্যবসায়ী সমিতি। তাঁদেরও এবছরের পুজো হল প্রতিমাহীন ঘটে-পটে।
নবদ্বীপের রাসে সবচেয়ে বেশি বলি এবং মানসিকের পুজো পড়ে তেঘরি পাড়ার বড়শ্যামা মাতা পুজোয়। প্রশাসনিক বিধিনিষেধ জানার পর তারাই প্রথম মাইকে করে শহর জুড়ে ঘোষণা করে বেরিয়েছিলেন এবছর বড়শ্যামার কাছে কোনও পুজো, মানসিক, বলি দেওয়া যাবে না। হলোও তাই। আদালত ও প্রশাসনের নির্দেশ মতো শহর ও শহর লাগোয়া প্রতিটি বারোয়ারী অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি স্বাস্থবিধির উপর বেশি জোর দিয়েছেন।
একই ভাবে নবদ্বীপের রাসের মূর্তিপুজোর একেবারে সূচনা পর্বের প্রতিমা ব্যাদড়া পাড়ার শবশিবা পুজো কমিটি ঘোষণা করেছিলেন তাঁদের পুজো মণ্ডপে এবছর ভক্তদের প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ। সেই মতো এদিন তাদের স্বেচ্ছাসেবকেরা কোনও দর্শনার্থীকে মণ্ডপের ধারে কাছে ঘেঁষতে দেয়নি। সাধারণের পূজো নেওয়া থেকে প্রসাদ বিতরণ,সবেতেই ছিল কঠোর নিষেধাজ্ঞা। আগমেশ্বরী বাজারের সুপ্রাচীন মহিষমর্দিনী মাতা পুজো কমিটি একই ভাবে তাঁদের পুজোয় বন্ধ রেখেছে চিরাচরিত ধারা। কেবলমাত্র পুরোহিত এবং তার সহযোগীরা ছাড়া কেউ মণ্ডপে প্রবেশ করতে পারেনি।
অন্যদিকে পুজো বউবাজার অন্নপূর্ণা মাতা কমিটি করোনা আবহে পুজোর ব্যাপারে এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পনেরো ফুটের প্রতিমা কমিয়ে চারফুট করা হয়েছে। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন প্রতিমা নিরঞ্জন হবে না। সদ্যনির্মিত মন্দিরে অন্নপূর্ণা মাতা সারাবছর ধরে পূজিত হবেন। মোটের উপর করোনা আবহে বৈচিত্রময় নবদ্বীপের রাস উৎসব এক ব্যতিক্রমী চিত্র দেখল শহরবাসী থেকে বহিরাগত হাজারও দর্শনার্থী।

Post a Comment